বাংলাদেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের অন্তর্গত বাগেরহাট জেলা শুধু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্যই খ্যাত নয়, বরং এখানকার মানুষের পেশা ও জীবিকা বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থান, সুন্দরবনের নিকটবর্তীতা, উর্বর কৃষিজমি এবং নানান প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে বাগেরহাটের পেশাগত ধারা অনন্য বৈচিত্র্য লাভ করেছে। কৃষক, মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী থেকে শুরু করে আধুনিক পেশাজীবী পর্যন্ত—সবাই এ জেলার অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
Table of Contents
বাগেরহাট জেলার পেশা ও পেশাজিবী

বাগেরহাটের অর্থনীতির ভিত্তি
বাগেরহাটের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো—
- কৃষি
- মৎস্য ও বনসম্পদ
- ব্যবসা ও বাণিজ্য
- ক্ষুদ্র শিল্প ও কারুশিল্প
- প্রবাসী আয়ের রেমিট্যান্স
এগুলোকে কেন্দ্র করেই জেলার পেশাগত কাঠামো গড়ে উঠেছে।
কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী
কৃষি প্রধান পেশা
বাগেরহাটের অধিকাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত। ধান, পাট, শাকসবজি, ডাল, তেলবীজ এবং বিভিন্ন মৌসুমী ফসল এখানকার প্রধান কৃষিপণ্য। বিশেষ করে ভৈরব, মধুমতি ও বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলো কৃষির জন্য উর্বর ভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কৃষকদের ভূমিকা
- খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা আনা।
- স্থানীয় বাজার ও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা।
- আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সার ও সেচ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো।
তবে কৃষিজীবীরা এখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকেন।
মৎস্যজীবী ও বনজীবী জনগোষ্ঠী
মৎস্য খাত
বাগেরহাট জেলার উল্লেখযোগ্য অংশ সুন্দরবনের কোলঘেঁষা। এখানে অসংখ্য নদী, খাল ও পুকুর থাকায় মাছ ধরা ও মাছচাষ প্রধান জীবিকা।
- মিঠাপানির মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং, মাগুর ইত্যাদি)।
- লবণাক্ত পানির চিংড়ি চাষ (বাগদা ও গলদা চিংড়ি) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়।
বনজীবী
সুন্দরবন থেকে মধু, গোলপাতা, কাঠ ও অন্যান্য বনজ দ্রব্য আহরণ অনেক মানুষের জীবিকা। মধু সংগ্রহকারীরা (মৌয়াল), গোলপাতা সংগ্রহকারীরা (বাওয়ালী) এবং কাঠ সংগ্রহকারীরা বহুদিন ধরে সুন্দরবনের সাথে জড়িত।
ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা
বাগেরহাট জেলার অর্থনীতিতে ব্যবসায়ী শ্রেণির অবদানও গুরুত্বপূর্ণ।
- হাটবাজার: কচুয়া, ফকিরহাট, মোড়েলগঞ্জ, রামপালসহ প্রতিটি উপজেলায় ছোট-বড় হাটবাজার আছে।
- খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা: কৃষিপণ্য, মাছ, চিংড়ি ও বনজ দ্রব্যের পাইকারি ব্যবসা চালু আছে।
- ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা: মিষ্টি শিল্প (বিশেষ করে “টক দই” ও “ছানার মিষ্টি”), গার্মেন্টসের ক্ষুদ্র উৎপাদন, আসবাবপত্র ও হস্তশিল্প স্থানীয় চাহিদা পূরণ করছে।
শ্রমজীবী ও দিনমজুর
গ্রামীণ অর্থনীতিতে শ্রমজীবীরা একটি বড় অংশ।
- কৃষিশ্রমিক, ইটভাটা শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক ও নৌকার মাঝি এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
- মৌসুমভেদে কাজের ধরন পরিবর্তিত হয়। কৃষি মৌসুমে জমিতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ে, আবার বর্ষাকালে নদী-নৌকা নির্ভর জীবিকা সামনে আসে।
আধুনিক পেশাজীবী
সময়ের পরিবর্তনে বাগেরহাটে আধুনিক পেশাজীবীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
- শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী
- সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা
- সাংবাদিক, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী
- আইটি পেশাজীবী ও ফ্রিল্যান্সার
এরা জেলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে এবং জাতীয় পরিসরে বাগেরহাটকে পরিচিত করছে।
প্রবাসী আয়ের ভূমিকা
বাগেরহাট জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবাসে কর্মরত, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে।
- রেমিট্যান্স পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত করছে।
- স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন ব্যবসা ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
নারী পেশাজীবী
গ্রামীণ সমাজে নারীরা আগে গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে নারীরা কৃষি, সেলাই, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্কুল-কলেজের শিক্ষকতা, স্বাস্থ্যকর্মী ও এনজিও কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হচ্ছেন।
- নারী উদ্যোক্তারা স্থানীয় বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন।
- পোশাক সেলাই, হস্তশিল্প ও দুগ্ধশিল্পে তাদের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে।
পেশাগত চ্যালেঞ্জ
- কৃষিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
- চিংড়ি খামারে রোগবালাই ও বাজারের অস্থিরতা।
- বনজীবীদের জীবনের ঝুঁকি (বাঘ ও দস্যু সমস্যা)।
- শ্রমজীবীদের অনিশ্চিত আয় ও কর্মসংস্থান সংকট।
- আধুনিক পেশাজীবীদের জন্য সুযোগের অভাব ও পরিকাঠামো ঘাটতি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাগেরহাটের পেশাজীবী সমাজ আগামীতে আরও সমৃদ্ধ হতে পারে যদি—
- আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
- চিংড়ি শিল্প ও মাছচাষ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া হয়।
- শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও আইটি খাত প্রসারিত করা যায়।
- পর্যটন শিল্প (ষাটগম্বুজ মসজিদ, সুন্দরবন, ঐতিহাসিক নিদর্শন) উন্নত করা হয়।
বাগেরহাট জেলার পেশা ও পেশাজীবীরা এ জেলার প্রাণশক্তি। কৃষক-শ্রমিকের ঘামে যেমন খাদ্য ও অর্থনীতি টিকে আছে, তেমনি মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও আধুনিক পেশাজীবীদের অবদান বাগেরহাটকে করেছে বৈচিত্র্যময়। নারীর অংশগ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ আগামী দিনে এই জেলার পেশাগত কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।
১ thought on “বাগেরহাট জেলার পেশা ও পেশাজীবী”