বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক জেলা হিসেবে পরিচিত বাগেরহাট, যা খুলনা বিভাগের অন্তর্গত। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী হওয়ায় এ জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসে অনন্য। বাগেরহাটের নামকরণ নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। এর ইতিহাসের ভাঁজে লুকিয়ে আছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা এই জনপদকে করেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অন্যতম ভাণ্ডার।

Table of Contents
বাগেরহাট জেলার পটভূমি
বাগেরহাট জেলার ভৌগোলিক অবস্থান
বাগেরহাট জেলা বর্তমানে একটি ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত জেলা। এর প্রশাসনিক কাঠামোতে রয়েছে ৯টি উপজেলা, ৭৫টি ইউনিয়ন, ১০৪৭টি গ্রাম এবং ৩টি পৌরসভা।
- ভৌগোলিক অবস্থান: ২২°৩২’ থেকে ২২°৫৬’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°৩২’ থেকে ৮৯°৪৮’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।
- সীমানা:
- উত্তরে: গোপালগঞ্জ ও নড়াইল জেলা
- দক্ষিণে: বঙ্গোপসাগর
- পূর্বে: পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা
- পশ্চিমে: খুলনা জেলা
বাগেরহাট নামের উৎস
বাগেরহাট নামকরণ নিয়ে একাধিক তত্ত্ব প্রচলিত, যা আজও গবেষকদের আলোচনার বিষয়।
- বাঘ থেকে নামকরণ
অনেকের মতে, সুন্দরবনের নিকটে বাঘের উপদ্রব ছিল প্রবল। ফলে অঞ্চলটির নাম হয়েছিল “বাঘেরহাট”। পরবর্তীতে উচ্চারণ ও সময়ের বিবর্তনে এটি হয়ে যায় “বাগেরহাট”। - খান জাহান আলী (র.)-এর খলিফাত-ই-আবাদ
আরেকটি মতে, বাগেরহাট নামটি হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর প্রতিষ্ঠিত ‘‘খলিফাত-ই-আবাদ’’ নগরীর সাথে সম্পর্কিত। এখানে ‘‘বাগ’’ শব্দের অর্থ বাগান বা সমৃদ্ধ এলাকা। সে সময় অঞ্চলটি উর্বর ও সমৃদ্ধ ছিল, তাই ‘‘বাগেরহাট’’ নামটির প্রচলন ঘটে। - বাঁকেরহাট থেকে বাগেরহাট
সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য মত হলো, ‘‘বাগেরহাট’’ নামটি ‘‘বাঁকেরহাট’’ থেকে এসেছে। ভৈরব নদীর উত্তর দিকের হাঁড়িখালী থেকে বর্তমান নাগের বাজার পর্যন্ত একটি দীর্ঘ বাঁক ছিল। সেই বাঁকের পাশে পুরনো বাজার গড়ে ওঠে, যা ‘‘বাঁকেরহাট’’ নামে পরিচিত হয়। পরে এই নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘‘বাগেরহাট’’।
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বাগেরহাটের ইতিহাস প্রাচীন জনপদ ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বিকাশের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
- খান জাহান আলী (র.)-এর অবদান:
হজরত খান জাহান আলী (র.) ১৫শ শতকে বাগেরহাটে আগমন করে এখানে এক সমৃদ্ধ নগর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ষাটগম্বুজ মসজিদ, খাঞ্জেলী দীঘি, রাস্তা, হাটবাজারসহ বহু স্থাপনা নির্মাণ করেন। ফলে বাগেরহাট ‘‘মসজিদের শহর’’ নামে খ্যাত হয়। - সমাধি ও শিলালিপি:
খান জাহান আলী (র.) ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তার সমাধি আজও ভক্তদের শ্রদ্ধা ও ভক্তির স্থান। মাজারে উৎকীর্ণ শিলালিপি তার সময়কার ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। - খলিফাত-ই-আবাদ:
তার প্রতিষ্ঠিত ‘‘খলিফাত-ই-আবাদ’’ শহর ছিল ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম সংস্কৃতির প্রসারে বাগেরহাট হয়ে ওঠে একটি ঐতিহাসিক কেন্দ্র।
বাগেরহাটের আধুনিক ইতিহাস
ব্রিটিশ আমলে বাগেরহাট খুলনা জেলার অংশ ছিল।
- ১৮৪৯ সালে মোড়েলগঞ্জে ইংরেজরা বন্দর স্থাপন করে, যা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
- ১৮৬১ সালে “মোড়েল-রহিমুল্লাহ সংঘর্ষ” নামে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘটন ঘটে, যা স্থানীয় ইতিহাসে উল্লিখিত।
- পরবর্তীতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাগেরহাটকে মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
- ১৯৮৪ সালে বাগেরহাট মহকুমাকে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে উন্নীত করা হয়। এর পর থেকে এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জেলা হিসেবে গুরুত্ব লাভ করে।
বাগেরহাটের ঐতিহ্য
আজকের বাগেরহাট ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ।
- ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং বাগেরহাটের প্রতীক।
- গোপালগঞ্জ শাহী মসজিদসহ অন্যান্য মসজিদ: ইসলামী স্থাপত্যের বৈচিত্র্য বহন করে।
- বাগেরহাট জাদুঘর ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: স্থানীয় ও বৈশ্বিক পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
এই ঐতিহ্য বাগেরহাটকে শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করেছে।

বাগেরহাট জেলার নামকরণের ইতিহাস আজও একটি রহস্যাবৃত বিষয়। ‘‘বাঘেরহাট’’, ‘‘বাগেরহাট’’ অথবা ‘‘বাঁকেরহাট’’—যেভাবেই হোক না কেন, এ নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। এ জেলার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের গর্বের সম্পদ।
গবেষকদের জন্য বাগেরহাট এখনও একটি অনুসন্ধিৎসু ক্ষেত্র। নামের উৎসের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থাকলেও ঐতিহ্যের বিশাল ভাণ্ডার বাগেরহাটকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
১ thought on “বাগেরহাট জেলার পটভূমি”